বাংলাদেশে বিসিএস (সাধারন শিক্ষা) ক্যাডার; শিক্ষক নাকি কর্মকর্তা?
বিসিএস পরীক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সকল প্রার্থীদের নিয়ে যায়। এর মধ্যে বিষয়ভিত্তিক ক্যাডারের একটা অপশন থাকে। সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজগুলোতে যে সব বিষয় আছে, স্নাতক পর্যায়ে যাদের সেই সব বিষয়ে পড়াশুনা করেছে তারা আবেদন করতে পারে। যেমন, উচ্চ শিক্ষায় যে প্রার্থী ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক, তিনি সরকারি কলেজের ইংরেজি বিষয়ে পড়ানোর সুযোগ পাবেন।
পিএসসি মৌখিক পরীক্ষার পরে বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসে প্রার্থীদের সুপারিশ করে থাকে। এ সুপারিশ করা হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বরাবর। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে গেজেট প্রকাশ করে থাকে। গেজেটের পরে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিজ নিজ কর্মস্থল বন্টন করা হয়।
মজার ব্যাপার হল, শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে গেজেট হলেও তারা পরিচিত হন শিক্ষক হিসেবে যার প্রারম্ভিক পদ হচ্ছে ‘প্রভাষক'। আপনি সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গকে বলতে শুনবেন তারা ‘কর্মকর্তা’ কিন্তু কাজ করছেন ‘শিক্ষক' হিসেবে। আসলে তারা কি, কর্মকর্তা নাকি শিক্ষক।
জনপ্রশাসন থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কলেজ বন্টন করা হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে। এর পরে তারা বন্টনকৃত কলেজসমূহে যোগদান করেন, পাঠদান করেন, বেতন ভাতাদি গ্রহণ করেন, সবই করেন উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সিলেবাস এবং নিয়মনীতি মেনে। এদের এক কলেজ থেকে আরেক কলেজে বদলির কাজও করে থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু, যে সকল কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভূক্ত বিষয়সমূহে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে সেখানেও এসকল শিক্ষকদেরই পাঠদান করতে হয়। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এসকল কর্মকর্তাদের কোন সংযোগই নেই। তারপরেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস পড়ানো, পরীক্ষা নেয়া, উতরপত্র মূল্যায়ণ, ফলাফল জমাদানের বিশাল কর্মযজ্ঞ তাদেরই পালন করতে হয়। সেক্ষেত্রে অনেক সময়ে অনেক কলেজেই দেখা যায় এইচএসসি অথবা অনার্স-মাস্টার্স যেকোন এক পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ হচ্ছে শিক্ষক সঙ্কট। সঙ্কট হবেই বা না কেন, কলেজগুলোতে তো উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়, অনার্স-মাস্টার্সের জন্য নয়।
এবার আবার ‘ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ন’। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের লোকজন কলেজে থাকতে শিক্ষক হিসেবে পরিচিত হলেও যখন বৈদেশিক উচ্চতর শিক্ষা, এমফিল, পিএইচডি অর্জন করতে যান বা দেশেই কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন, তখন আবার তারা কর্মকর্তা হয়ে যান, সমস্ত কিছুর জন্য অনুমতি নিতে হয় কোথা থেকে, জানেন? জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে। শুধু এখানেই শেষ নয়, লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যে কোন ধরনের প্রশিক্ষণ, প্রেষণ, বৈদেশিক ট্যুর এমনকি ওএসডি করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ই কাজ করে থাকে।
এখন কথা হল বিসিএস ক্যাডার হিসেবে যোগদান করে অন্য সার্ভিসের ক্যাডাররা যেখানে একটা নির্দিষ্ট কর্মস্থল পান সেখানে বিসিএস (সাধারন শিক্ষা) ক্যাডারগণ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দপ্তরের কাজ করে থাকেন, করতে হয়। ব্যাপারটা এমন যেন, সন্তানের অভিভাবক একজন আর শাসন করছে চৌদ্দজন। সে কারনেই বলা, আসলে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ ‘কর্মকর্তা’ নাকি ‘শিক্ষক’? বিষয়টা আসলেই ভেবে দেখা দরকার।
সরকারি কর্ম কমিশনের ওপর এমনিতেই অনেক চাপ, তার ওপর টেকনিক্যাল ক্যাডারসহ শিক্ষা ক্যাডারের জন্য আলাদা লিখিত পরীক্ষা নেয়াটা বাড়তি চাপ বলেই মনে হয়। সমস্যার সমাধানের জন্য সরকারি এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য আলাদা কমিশন গঠন করে দেয়া যেতে পারে যারা সরকারি কর্ম কমিশনের মতই স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সায়ত্তশাসিত হবে। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের নিয়োগ প্রদান করবে এবং দেখভালের দায়িত্ব থাকবে উক্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানের ওপরে। শিক্ষক যদি কর্মকর্তার মত আচরন করেন তা যেমন বেশি রাশভারী মনে হয় তেমনি কর্মকর্তা যদি শিক্ষক হন তবে তা চাপিয়ে দেয়ার মত করে মনে হয়। শিক্ষক হবেন প্রকৃত শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান পিপাসা মেটানোই তার কাজ হবে। তিনি কেন এই দপ্তর থেকে ওই দপ্তরে তার কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরবেন। শিক্ষকের মান মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব যেমন সরকারের, তেমনি আমাদেরও। জয় হোক শিক্ষকতার মত মহান পেশার, সমস্যা লাঘব হোক আমাদের বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারদের।
নাজমুল হাসান মেহেদি

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন